জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনকে সামনে রেখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রস্তাব। এর মধ্যে অন্যতম হলো পুলিশের হাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র, যেমন চায়নিজ রাইফেল, সাব মেশিনগান (এসএমজি), এবং ৯ এমএম পিস্তল না রাখার সুপারিশ। কেউ কেউ শটগান ও ছররা গুলির ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
গত জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে। সরকারি হিসাবে, এই অভ্যুত্থানে ৮২৬ জন নিহত হন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের নির্বিচার অস্ত্র ব্যবহার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। আহতদের শরীরে গুলির ক্ষত এবং শটগানের ছররা গুলির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে চিকিৎসকেরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিলেটের ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ প্রস্তাবে উল্লেখ করেছেন, শটগানসহ প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে তিনি এই অস্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা এই প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের সুরক্ষার জন্য পুলিশের হাতে কিছু প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ডাকাত ও সশস্ত্র অপরাধীদের মোকাবিলা করতে এমন অস্ত্রের প্রয়োজন হয়।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, "প্রাণঘাতী অস্ত্র একেবারে নিষিদ্ধ করা অবিবেচনাপ্রসূত। তবে এর ব্যবহার সীমিত করা যেতে পারে।"
ডিসিরা পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষমতা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব করেছেন। ১৯৭৭ সালে স্থগিত হওয়া এই বিধান কার্যকর করলে জেলা প্রশাসকদের পুলিশ তত্ত্বাবধানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি নির্বাহী বিভাগকে আরেকটি নির্বাহী বিভাগের তত্ত্বাবধানে রাখা ঠিক নয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করার সুপারিশ করার পরিকল্পনা করছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহিম জানিয়েছেন, ডিসিদের প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য এসব প্রস্তাব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে বিরোধের কারণে জনগণ যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল বলেন, "পুলিশের ক্ষমতা বেড়েছে এবং ডিসিদের মর্যাদা কমেছে। এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।"
ডিসি সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো সরকারের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কটি শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
0 মন্তব্যসমূহ