বিগত সরকারের সময়ে দেশের ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে। এই খাতকে ধ্বংস করতে ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। নামমাত্র ও বেনামে ঋণ বিতরণ, বিদেশে অর্থপাচার এবং ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
ফলস্বরূপ, ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এখন শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে, যার চড়া মূল্য সারা দেশে মানুষ বহন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ২০২৩ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৩৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। ফলে আট বছরে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ৫২টি এবং ৯টি বিদেশি ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে মোট ৭৬০ পরিচালক রয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে শতাধিক পরিচালক রয়েছে যারা সমঝোতা ভিত্তিক বড় অঙ্কের ঋণ লেনদেন করেন, এবং ডজনখানেক পরিচালক সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। আসলেই, তাদের হাত থেকেই পুরো ব্যাংকিং সেক্টর জিম্মি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন উদ্যোগ হিসেবে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক গ্রুপের কবজায় আটটি ব্যাংক ছিল। এই ব্যাংকগুলোতে গ্রুপের মালিক, তার ছেলে, পরিবারের সদস্য অথবা পছন্দের ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান হিসেবে বসানো হয়েছে। বিগত সরকারের সময়, প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই ইচ্ছামতো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। আবার, এক ব্যাংকের চেয়ারম্যান অন্য ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সাথে যোগসাজশ করে ক্ষতিতে ঋণের সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন অনিয়ম করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার মতে, ব্যাংক খাতে পরিচালকদের লুটপাট দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
লুট ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালকদের জন্য নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ওপর কঠোর আইন জারি করেছে। এখন, অনেক পরিচালকেরা নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছেন না, তাই তারা অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করছেন। যারা সুবিধা পাচ্ছেন, তাদের নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ ছাড়াতেও সহায়তা করছে ব্যাংক পরিচালকরা। এইভাবে, ব্যাংক পরিচালকরা মিলেমিশে লুটপাট করতে নেমে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগে পরিচালকেরা তাদের নিজ ব্যাংক থেকেই বেশি ঋণ নিতেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মের কারণে তারা নিজেদের মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নিতে পারছেন না। অন্যদিকে, অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে কোনো বাধা না থাকায়, এখন পরিচালকরা পরস্পর যোগসাজশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন এবং প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সুবিধা লাভ করছেন।
কিছু পরিচালক তাদের ঋণের তথ্য গোপন করার জন্য বেনামি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন, যেখানে ব্যাংক পরিচালকের আত্মীয় বা পরিচিতজনের মালিকানা রাখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে, অনেক পরিচালক তাদের ড্রাইভার ও সহকারীদের নাম ব্যবহার করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে মোট ১,৩৪০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। অপরদিকে, অন্য ব্যাংক থেকে তারা ঋণ নিয়েছেন প্রায় ২,৩২,৫৪৫ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে পরিচালকদের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২,৩৩,৮৮৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিচালকদের নামে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঋণ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে, বিগত ১৫ বছরে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বেনামে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ হিসাব করলে, পরিচালকদের ঋণ পাঁচ লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৮টি ব্যাংক পরিচালকদের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ব্যাংক পরিচালকদের পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছেন। আর, দুটি ব্যাংকের পরিচালক নিজের ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন।
নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের পাঁচটি ব্যাংক, যেখানে ব্যাংকটির পরিচালকরা নিজেদের ব্যাংক থেকে প্রায় ১,২৫১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন।
ব্যাংকারদের মতে, পরিচালকদের বেআইনি ও অনৈতিক চাপে ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা দিশাহারা হয়ে পড়ছে। পরিচালকদের অব্যাহত চাপের ফলে দুর্নীতি এবং অনিয়মের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশীয় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হওয়ায়, বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রতিযোগিতা চলছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নজিরবিহীন দুর্নীতি ঘটছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রত্যেক ব্যাংকেই এখন বেনামী ঋণের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে, এবং পরিচালকদের চাপের মুখে এমডিরা ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, ঋণের ক্ষতি সৃষ্টিকারী কিছু ব্যাংকের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। তিনি指出 করেন যে, ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিচালকদের ঋণ সংক্রান্ত যে আইনটি রয়েছে, তা দুর্বল। এর ফলে পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্নভাবে ঋণ বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি সুপারিশ করেন, যেন ভবিষ্যতে এই ধরনের আইনের অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক পরিচালকদের জন্য ঋণের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে পরিচালকরা প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, যার ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যা সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে। চতুর্থ স্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, যেখানে পরিচালকরা সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন, এবং পঞ্চম স্থানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, যার ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া, অন্যান্য ব্যাংকের পরিচালকদেরও পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রদান করেছে আরো ১১টি ব্যাংক। বর্তমানে, ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি, যেখানে ব্যাংক পরিচালকদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫৭ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এসব খেলাপি ঋণের বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের, যা থেকে পরিচালকদের নেওয়া ঋণের ৭১৬ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। তালিকায় তিনটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যাংকগুলোর খেলাপিদের ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে ও সাবেক ব্যাংক পরিচালকদের, তাদের স্ত্রীরা, পুত্র-পুত্রি, কিংবা নিকটাত্মীয়দের কাছে আটকা পড়ে আছে। ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন এবং বিতরণের প্রতিটি পর্যায়ে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

0 মন্তব্যসমূহ