Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

ক্রেতার স্বার্থের প্রতি উদাসীন, সিন্ডিকেটের ফাঁদে আটকা পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

ক্রেতার স্বার্থে নয়, সিন্ডিকেটের ফাঁদে পা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যবসায়ীদের পরামর্শে দুই ধাপে শুল্ককর কমানোর পরও ভোজ্যতেলের দাম ভোক্তার জন্য সহনীয় করতে পারেনি সরকার। বরং, সিন্ডিকেট করে প্রয়োজনীয় সয়াবিন তেল বাজার থেকে উধাও করে দিয়ে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন এবং দাম বাড়িয়েছে। যদিও সরকারিভাবে লিটারে ৮ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে, বাস্তবে তারা মাসব্যাপী ২৮ টাকা বেশি দামে তেল বিক্রি করেছে।



এর ফলে দেখা যাচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা মাসে ভোক্তার পকেট থেকে প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা লোপাট করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ব্যবসায়ীদের দেখানো পথেই হাঁটছে, ফলে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছে।

বুধবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২২ লাখ টন, যার মধ্যে এক মাসে প্রয়োজন পড়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৩৩ টন। প্রতিদিন ৬ হাজার ১১১ টন তেল লাগে, যা লিটার হিসেবে ৬১ লাখ ১১ হাজার ১১১ লিটার। সেক্ষেত্রে, লিটারে ২৮ টাকা বেশি দামে বিক্রি করার পর মাসে ভোক্তার পকেট থেকে ৫১৩ কোটি টাকারও বেশি চুরি হয়েছে।

এদিকে, চিহ্নিত ব্যবসায়ীরা এই টাকা লুটের জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেছেন, সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আগে থেকেই কোম্পানিগুলো এক মাস আগেই লিটারে প্রায় ২৮ টাকা বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করে আসছিল। ফলে, মাসের ব্যবধানে ভোক্তার পকেট থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি লুট করা হয়েছে। তবে এই লুটপাটের আসল পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কিন্তু সরকার ক্যাবের কথা শুনতে চাইছে না; আগের শেখ হাসিনার সরকারও শুনেনি, এবং বর্তমান সরকারও শুনছে না। এর ফলে ভোক্তার ক্ষতি হচ্ছে।

ভোজ্যতেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা হায়দার জানান, তারা আবার সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি টন তেলের দাম ১২০০ ডলারে উঠেছে। গত এপ্রিল মাসে যখন সরকার তেলের দাম নির্ধারণ করে, তখন বিশ্ববাজারে প্রতি টন তেলের দাম ছিল ১০৩৫ ডলার। বর্তমানে ১১০০ ডলার দামে লিটারে ৮ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ডিসেম্বরে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১,১০৫ ডলার। আগস্টে দাম কমে দাঁড়িয়েছে ১,০৩১ ডলারে, এবং সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে ১,০৪৪ ডলারে উঠে এসেছে। তবে সার্বিকভাবে সয়াবিনের দাম নিম্নমুখী, নভেম্বরে  তুলনায় ৫.৫২% কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে।

পাশাপাশি, জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার থেকে ৭৮ ডলারে নেমেছে, যাতে জাহাজভাড়া ও অন্যান্য পরিবহণ খরচ কমেছে। দেশের মধ্যে ডলারের দামও হ্রাস পেয়ে ১৩২ টাকার থেকে ১২০ টাকায় নেমে এসেছে। এসব কারণে আমদানি খরচ কমে আসার কথা, অথচ বাজারে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না; বরং দাম আরও বাড়ছে।

এর পাশাপাশি, ভোজ্যতেলের সরবরাহ বাড়াতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণ রাখতে সরকার আমদানিতে দুই দফায় শুল্ককর কমিয়েছে। প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯ নভেম্বর শুল্ককর কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার ফলে লিটারে শুল্ককর কমেছে ১০-১১ টাকা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে দাম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু যে সয়াবিন তেল আমদানি করতে হয়, সেটি মালয়েশিয়া থেকে আনতেও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসতে দুই থেকে তিন মাস লেগে যায়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের এই অজুহাত পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।

এছাড়া, শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায়নি এবং এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে মজুতগুলি পর্যাপ্ত, কিন্তু সরবরাহ চেইনে সমস্যা রয়েছে। সরকার এই সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বরং ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পা দিয়েছে। ফলে তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে, আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমানে সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; পূর্ববতী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও ঠিক সেই একই পথ অনুসরণ করছে।

সব মিলিয়ে সরকার লিটারে ভোজ্যতেলের দাম ৮ টাকা বাড়িয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৫৭ টাকা এবং পাম তেলের খুচরা মূল্যও ১৫৭ টাকা। তবে বাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলেও এই দাম কার্যকর হয়নি। ব্যবসায়ীরা এখানে অনৈতিক কার্যকলাপ করছে; কারণ বোতল জাত তেলের দাম যথাযথভাবে ঠিক রাখা হলেও খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৮৫ টাকায়, যা গত এক মাস ধরে একই রয়েছে।

রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি বিক্রেতা সোহেল জানান, সরকার নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোম্পানিগুলো লাভের সুযোগ পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ লিটারের তেল ৮৩৭ টাকায় কিনতে হচ্ছে, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৮৫২ টাকায়। তিন লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ৫১৬ টাকায় কিনতে হয় এবং বিক্রি করা হচ্ছে ৫২৫ টাকায়। খোলা সয়াবিনের ক্ষেত্রে, ডিলারদের কাছ থেকে লিটারপ্রতি ১৮৮ টাকায় কিনে ১৮৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা কিছুকাল যাবৎ একই দামে চলছে। পাম তেল ১৭৫ টাকায় বিক্রি হলেও কিনতে হচ্ছে ১৭১ টাকায়।

তিনি বলেন, ডিলাররা এখনো তেলের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেনি এবং সরকারি মূল্যের বাড়তি দামে বিক্রির জন্য তারা সংকট তৈরি করে রেখেছে। এক লিটারের তেল এখনো ডিলাররা দেয়নি। সরবরাহ করলে ১৭৫ টাকায় বিক্রি করতে হবে, কিন্তু কিনতে হবে ১৭২ টাকায়। তারা অতিরিক্ত মুনাফার লক্ষ্যে খোলা তেল বিক্রি করায় বোতলজাত এক লিটারের তেল সরবরাহ করছে না। বর্তমানে কোম্পানিগুলো আমাদের প্রতি লিটার ৩ টাকা লাভ করার সুযোগ দিয়েছে, যা আগে ৪-৫ টাকা ছিল। ফলে ভোক্তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ